দ্বীনি পরিবার

মাগরিবের সালাত আদায়ের পর মা ছোট বোনকে কুরআন পড়াচ্ছিলেন। আর আমি সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্ত করছিলাম। মহান রবের পবিত্র কালামের গুনগুন সুর মূর্চ্ছনায় আবেশরণিত হচ্ছিলো হৃদয় মুকুর। জান্নাতী সুবাস ভাসছিলো বাতাসের প্রতিটি অণুতে। কুরআন বন্ধ করে দু’জনের দিকে তাকালাম। এমন দৃশ্য সব ফ্যামিলির জন্য মহান রব বরাদ্দ রাখেন না।

মুসলিম হয়ে যদি দ্বীনি ফ্যামিলিতে আপনার জন্ম না হয় তবে দ্বীন পালন করা আপনার জন্য এক মহা যুদ্ধ! আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা সেই রবের যিনি এ অধমকে এমন অতুলনীয় নিয়ামাহ দান করেছেন!
.
.
আপনার পরিবার যদি দ্বীনি হয়, তবে দ্বীনের নিয়ম-কানুন, রবের বিধি-নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে তা হয় বিশাল এক প্লাস পয়েন্ট। শয়তানের আর নিজের নফসের ধোঁকায় কোন খারাপ কিছু করতে গেলে আপনার বাবা মায়ের স্নেহের পরশ অথবা শাসনের চোখ রাঙানির ওয়াসিলায় টলোমলো পা দু’টোকে ঠিকই আবার সোজা পথে দাঁড় করিয়ে দেন আপনার রব, যিনি গাফুরুর রহিম।
.
.
যে সমস্ত পথ হারা ভাই-বোন সদ্য সঠিক পথে পা রেখেছেন, নিজের গুনাহের কর্দমাক্ত শরীরটাকে অনুশোচনার অশ্রুর সাগরে ডুবিয়ে পরিশুদ্ধতার চাদরে নিজেকে আবৃত করেছেন তাদের কাছে যদি দ্বীনি পরিবার নামক এই নিয়ামাহ্ না থাকে, তারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন এর অপরিহার্যতা।
.
.
আধুনিক মডার্ন পাশ্চাত্য সংস্কৃতি লালন করা ফ্যামিলিগুলোর মধ্যে যারা গোমরাহীর ভেতর থেকে নিজেদেরকে বের করে জীবনটাকে রবের রঙে রাঙাতে চান, তাদের সর্বপ্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায় সবথেকে কাছের প্রিয় মুখগুলো!

মেয়ে অর্ধ-উলঙ্গ পোশাক বাদ দিয়ে পরিপূর্ণ পর্দা শুরু করেছে, মাহরাম তালিকা ফলো করছে। ছেলের ক্লিন শেভ মুখে সুন্নতি দাড়ি শোভা পাচ্ছে, টাখনুর উপরে প্যান্ট উঠেছে। নামাজ, রোজা, রবের হুকুম-আহকাম পালন শুরু করেছে। এসব কর্মকাণ্ড দেখে উনাদের কপালে বিশাল এক চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। সন্তানেরা বোধহয় আবার সেই মধ্য বর্বর যুগে ফিরে গেছে। সুশীল সমাজে তাদের নাক কেটে যাওয়ার উপক্রম! এগুলো কি মেনে নেওয়া যায়!এসব ভাবনা থেকেই আসে অনেক বাধা-বিপত্তি।
.
.
নিজ লাইফেই দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি বহুবার। ফ্রেন্ড নামাজ-পর্দা করতো না। দাওয়াত দেওয়ার পর নিয়মিত নামাজ, হাত’পা মোজাসহ পর্দা শুরু! বুঝাতে পারবোনা তখন কেমন অসাধারণ অনুভূতি সমস্ত চিত্তকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তারপর যতই বিস্ময় ভরা চোখ নিয়ে তাদের দ্বীনে ফেরা দেখেছি, তার চেয়ে বেশি বিস্ফোরিত চোখে আবার গোমরাহীর আঁধারে হারিয়ে যেতেও দেখেছি। প্রশ্ন করলেই অসহায় চোখে একটাই জবাব-কি করবো বল! ফ্যামিলি সাপোর্ট করে না!

আর যাদের বক্ষে রহমানুর রাহিম তাঁর হেদায়েতের নূর ঢেলে ঈমানী মজবুতি দান করেন, তারা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে এই প্রিয় মুখগুলোর সাথে। প্রিয়জনের প্রতিটি আঘাতে আরও বেশি স্ফুরিত হয় ঈমানী চেতনা।
.
.
আবার আমাদের সমাজে কিছু পোড়া কপাল হতভাগাদেরও দেখা মিলে। তারা দ্বীনি প্যারেন্টস্ পায় ঠিকই, কিন্তু রবের দেওয়া এই অমূল্য উপঢৌকন তাদের কাছে চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়! উচ্ছন্নে যাওয়া এসব সন্তানেরা পিতা-মাতার জীবনটাকে দুনিয়ার বুকে জাহান্নাম সমতুল্য বানিয়ে ছাড়ে। যে সন্তানদের নিয়ে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে এক টুকরো জান্নাতের আশা হৃদয় গহীনে লালন করতো সেই সন্তানেরাই যখন চোখের সামনে ধীরে ধীরে জাহান্নামের দোরগোড়ায় উপস্থিত হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তখন তাদের বুক ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস আর জায়নামাজের সেজদায় প্রভুর কাছে অশ্রু বিসর্জন করা ছাড়া আর কোন উপায়ন্তর থাকেনা।
.
.
তাই, যেমন দ্বীনি ফ্যামিলি পাওয়া মহান রবের তরফ থেকে জান্নাতি নিয়ামাহ্ ঠিক তেমন নেক সন্তানও এর অন্তর্ভুক্ত।

এক একটি পুতি দানার গাঁথুনিতে যেমনিভাবে একটি সম্পূর্ণ কণ্ঠহার পরিপূর্ণতা পায়, তেমনিভাবে একটি ফ্যামিলির প্রতিটি সদস্য যখন রবের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে একনিষ্ঠ দাসে পরিণত হতে পারে কেবল তখনই প্রতিটি ফ্যামিলি হয়ে ওঠে দুনিয়ার বুকে একেকটি জান্নাতের টুকরো!

__________________
আয়িশাহ্ বিনতে রূহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *