মোদি-মমতার করোনা রাজনীতি

মোদি-মমতার করোনা রাজনীতি

ভারতের নানা প্রান্তে লকডাউন ঘিরে আর্থসামাজিক জীবন একটা ঘোরতর সংকটের মুখে পড়তে চলেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী—কেউই লকডাউনে গভীর সংকটে পড়া দেশের একটা বড় অংশের মানুষ কেবল বেঁচে থাকতে কী খাবে, এই দিশা দেখানোর ধারপাশ দিয়ে হাঁটেননি।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে এখানকার রাষ্ট্রপ্রধানদের ভূমিকার নিরিখে একটা তুলনামূলক জায়গাতে চলে এসেছে বাংলাদেশ। করোনা সংকটের মোকাবিলায় একটি অবৈজ্ঞানিক শব্দ উচ্চারণ না করে, নিজের বোধ, সেই বোধে আধ্যাত্মিক চেতনা থাকলেও, সেই চেতনাকে একটিবারও কুসংস্কারাচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির দিকে পরিচালনা করেননি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।

অপর পক্ষে করোনাজনিত অতিমারিকে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে ঘণ্টা বাজানো, থালাবাটি বাজানো, ইলেকট্রিক আলো বন্ধ করে মোমবাতি-প্রদীপ জ্বালানোর মতো চরম অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন পথে দেশকে পরিচালিত করার জন্য প্রকাশ্যে সাওয়াল করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এই অপবিজ্ঞান ঘিরে বামপন্থীরা ছাড়া ভারতের একটি রাজনৈতিক দল একটিও কথা বলেনি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট রাজনীতির নিরিখে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন বিজেপির। তিনিও একটিবারের জন্য এই প্রশ্ন তোলেননি যে মারণ ভাইরাস ঠেকাতে থালাবাটি বাজানো বা মোমবাতি জ্বালানোর কী সম্পর্ক।

রাষ্ট্রশক্তির এই নিস্পৃহ মানসিকতাই সব নয়। রাজ্যে যখন হাজারো মানুষ কেবল পেটের ভাতটুকু জোগাড়ের তাগিদে ভিন রাজ্যে শ্রমদান করতে গিয়ে লকডাউনে আটকে রয়েছেন, তাঁদের ফেরানোর জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা প্রশাসন করছেন না। এই অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষকে প্রকাশ্যে উপদেশ দিচ্ছেন; আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ দিয়ে ভাত খান। এতে করোনা মোকাবিলায় ইমিউনিটি পাওয়ার বাড়বে। ষোড়শ লুইয়ের পত্নী ম্যাঁরি অ্যাঁতয়নেতের সঙ্গে কোনো ফারাক আর নিজেকে রাখলেন না মমতা।

বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ—দুটি জায়গাই আমফানের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনাজনিত পরিস্থিতির ভেতরে আমফান মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রশাসনের ভূমিকা আর পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের ভূমিকা পাশাপাশি রাখলে চমকে উঠতে হয়। আমফানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর নাম করে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল যা করেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে একটা বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

তৃণমূল দলের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন, যাঁদের একটা বড় অংশকে বিত্তশালী বললেও কম বলা হয়, তিনতলা বাড়ি, গাড়ি, এসি মেশিন, বিলাসের হাজারো সামগ্রী—কী নেই তাঁদের। সেসব মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আমফানে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি সারাইয়ের টাকা ঢুকেছে দেদার। বিষয়টি ঘিরে তুমুল রাজনৈতিক চাপান–উতোরের পর মমতার সরকাই আবার মানুষের করের টাকায়, তাদের নেতাদের অ্যাকাউন্টে আমফানের কারণে ঢোকা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ফরম ছাপিয়ে বিলি করেছে।

আজ পর্যন্ত বিশ্বে ক্ষমতাসীন কোনো রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে নিজেদের দুর্নীতি ঘিরে এতখানি প্রকাশ্যে নাকানিচুবানি খেয়েছে কি না, জানা নেই। দুর্নীতিকে একটা শিল্পের পর্যায়ে না নিয়ে যেতে পারলে যে, জনগণের টাকাতেই সরকারিভাবে ফরম ছেপে চুরির টাকা ফেরতের প্রশ্নটি আসত না—তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

করোনা সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গোটা ভারতের মতোই পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজনীতি করার একমাত্র হকদার হলো এখানকার শাসক দল। মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের মতো ছোটখাটো জমায়েত করছে, থানা ঘেরাও করছে দলীয় কোন্দল সামাল দিতে। কিন্তু বিরোধী বামপন্থীরা মমতার সরকারের করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্পূর্ণ বেহাল নিয়ে যদি সরকারি বিধিনিষেধ মেনে একটু মাইকিংও করে, তাহলে বামপন্থীদের হাজারো রকমের মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে।

করোনাকে ঘিরে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা লুকাতে যেভাবে গোটা আমলাবাহিনীকে মমতা ব্যবহার করছেন, তাতে কেবল স্বাস্থ্য সংকটই এখানে যে তীব্র হচ্ছে, তা নয়; মমতার এই আচরণ ভারতের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোতে আমলাবাহিনীর অবাধ হস্তক্ষেপের জায়গাটিকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। এই আমলাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে যে একদিন সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভারতে গ্রাস করতে চাইবে না, এই আশঙ্কা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?

করোনা সংকটের এই সময়ে কালোবাজারিদের একদম ফুলেফেঁপে ঢোল হয়ে যাওয়ার দশা। একাংশের বিত্তবান লোকদের প্রয়োজনের থেকে বেশি মজুত করার তাগিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গোটা ভারতের মতোই পশ্চিমবঙ্গজুড়ে চলছে অবাধ কালোবাজারি। ফলে যে অংশের মানুষদের কাছে মজুত টাকা আছে, বসে খাওয়ার মতো সঞ্চয় আছে, তারা দামাদামের পরোয়া না করে খাদ্যসামগ্রী মজুত করছে। অন্যপক্ষে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা কালোবাজারিদের সঙ্গে, মজুতদারদের সঙ্গে এঁটে না উঠতে পেরে ক্রমেই মৃত্যুর পথে এগিয়ে চলেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *