গবাদি পশুর বিরল ভাইরাসের দুশ্চিন্তা

গবাদি পশু গরু এর বিরল ভাইরাসের দুশ্চিন্তা

55 বছরের বিধবা বুলবুলি। গরু পালন করে সংসার চালান। মাস তিনেক আগে তার পালিত গাভীর একটি বাছুর হয।় বুলবুলি আশায় বুক বেঁধেছিলেন এই গরুর দুধ বিক্রি করে অন্তত আগামী একবছর নিশ্চিন্তে তার সংসার চলবে,আর এই এঁড়ে বাছুর বড় হলে বিক্রি করে তিনি একসঙ্গে থোক টাকা পাবেন। কিন্তু তার স্বপ্ন বাধ সাজে বিরল এক ভাইরাস। ওই ভাইরাসের সংক্রমণের শরীরের নানা স্থানে ফুলে ওঠে আর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এভাবেই বুলবুলির গাভীর বাছুর টি এক সপ্তাহ আগে মারা যায়। সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের টাপুরচরের বাসিন্দা বুলবুলির মতো জেলার হাজারো খামারি গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। সামনে কোরবানি ঈদ। এই সময় হঠাৎ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এ লোকসানের আশঙ্কা করছেন খামারিরা। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের অক্টোবরের এই আফ্রিকান ভাইরাসের সংক্রমণে এবার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলছে কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিরল ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকলেও প্রাণী চিকিৎসকরা বলছে এটি “লাম্পি স্কিন ডিজিস” যা সাধারণত এক ধরনের আরএনএ ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। এই রোগে আক্রান্ত গবাদি পশুর চামড়া ফুলে গোটা গোটা সৃষ্টি হয়। পরে এসব গোটা হেঁটে ঘা এর মতো হয়ে যায়,তারপর আক্রান্ত পশুর জ্বর আসে। পশু অত্যন্ত দুর্বল হয়ে ওজন হ্রাস পায় এবং পরে মারা যায়। ভেটেরিনারি সার্জন রাখছেন, আক্রান্ত পশুর মধ্যে বাছুরের মৃত্যু ঝুঁকি একটু বেশি। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানিয়েছে জেলায় এই ভাইরাসের সংক্রমণে পর্যন্ত প্রায় চার হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। 2% গরু মারা গেছে। শুধু সদর উপজেলায় অন্তত 500 থেকে 700 গরু আক্রান্ত। অনেক গরু আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পৌঁছাচ্ছে না। অনেকের বাধ্য হয়ে কসাইয়ের কাছে এসব রোগাক্রান্ত গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। সদর উপজেলার পৌর এলাকার বকসিপাড়ার গ্রামের খামারি মোস্তাফিজার জানান তার খামারে সাতটি গরু এ রোগে আক্রান্ত এর মধ্যে তিনটি অবস্থা এখনো খারাপ। ঈদে উপযুক্ত দাম পাওয়া নিয়ে সংশয় আছি। সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে 25 টি গরু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য প্রানি সম্পদ দপ্তর এ আসছে।আকস্মিক এই বিরল রোগে আক্রান্ত গবাদিপশু মৃত্যুর হার কম হলেও এর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনও পাওয়া যায়নি। আক্রান্ত গরুর ওজন কমে যাওয়া সহ চামড়ায় ক্ষত হওয়াই ঈদের বাজারে সব গরুর কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাবে না। তিনি জানান, আক্রান্ত পশুর রোগ লক্ষণ দেখে পেনিসিলিন, এন্টি হিস্টামিন, আইভার মেক্টিন জাতীয় মেডিসিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। এছাড়াও জ্বর হলে আক্রান্ত পশুকে প্যারাসিটামল দেওয়া হচ্ছে। রোগ রোগ প্রতিরোধে গবাদিপশুকে মশা-মাছি থেকে দূরে রাখতে হবে। আক্রান্ত পশুকে অন্য পশুর থেকে আলাদা রাখার পরামর্শ ভেটেরিনারি সার্জনের। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার আব্দুল হাই সরকার জানান এই রোগে মৃত্যুহার কম। অনলাইন বিসিবি বাংলা থেকে জানা গেছে ময়মনসিংহসহ,নীলফামারী, নওগাঁ সহ বেশ কয়েকটি জেলায় প্রায় সবকটি উপজেলার গবাদিপশুর মাঝে ব্যাপক হারে লাম্পি স্কিন ভাইরাসজনিত রোগ দেখা দিয়েছ। বাংলাদেশে গত বছর এই রোগ প্রথমবার দেখা দিলেও এবারের ব্যাপকতা গত বছরের চাইতে বেশি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, তিনি আগে কখনো গরুরে এ ধরনের রোগ দেখেননি। তার গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান। এ রোগে গবাদিপশুর মৃত্যুর আশংকা কম হলেও দুধের উৎপাদন এবং চামড়ার গুনগত মানের এর ওপর প্রভাব ফেলে। আক্রান্ত পশুর চামড়া সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় সেটা বিক্রির অযোগ্য হয়ে যায়। আবার গাভী আক্রান্ত হলে দুধের উৎপাদন কমতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে উস্কো ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই রোগের বিস্তার হতে পারে। আবার ভাইরাসজনিত এই গ্রুপটি বেশ সংক্রামক এবং মশা/মাছির মাধ্যমে সেটি ছড়িয়ে পড়ে বলে তারা জানিয়েছেন। আক্রান্ত গরুর দুধে 100 ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটে খেলে এবং মাংস ভালোভাবে রান্না করে খেলে কোন স্বাস্থ্যঝুঁকি না থাকলেও, অসুস্থ গরুর কসাইখানায় পাঠাতে মানা করেছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।এই স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার কারণে এই ভাইরাস জনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Writer: Md. Shaiokh Sahariar Haque

For Inquiry : Contact Us

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *